এভারকেয়ার বিডি
প্রকাশনা
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস: যখন ত্বক ও জয়েন্টের সমস্যা একসাথে যুক্ত

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস: যখন ত্বক ও জয়েন্টের সমস্যা একসাথে যুক্ত
Author

ডা. ফারজানা সুমি

লেখক

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস (PsA) একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগ, যা এমন দুটি অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত যেগুলোকে অনেকেই আলাদা মনে করেন— সোরিয়াসিস (একটি ত্বকের রোগ) এবং আর্থ্রাইটিস (জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির প্রদাহ)। সোরিয়াসিসে আক্রান্ত প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় একজন পরবর্তীতে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে আবার ত্বকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেও এই রোগ শুরু হতে পারে।

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস কী?

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ত্বকের পাশাপাশি জয়েন্ট, টেন্ডন এবং কখনও কখনও মেরুদণ্ডেও আক্রমণ করে। এর ফলে জয়েন্টে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং ফোলাভাব দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি স্থায়ী জয়েন্ট ক্ষতির কারণ হতে পারে।

লক্ষণগুলো যেগুলো খেয়াল রাখা জরুরি

• জয়েন্টের সমস্যা:

জয়েন্টে ফোলা, ব্যথা ও শক্ত হয়ে যাওয়া—বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বেশি অনুভূত হয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডও আক্রান্ত হতে পারে, যার ফলে চলাফেরা করতে অসুবিধা হয়। সাধারণত সকালে এই শক্তভাব ৩০ মিনিট বা তার বেশি সময় থাকে এবং হালকা ব্যায়াম করলে কিছুটা কমে।

• ত্বক ও নখের পরিবর্তন:

ত্বকে লালচে, খসখসে দাগ (সোরিয়াসিসের লক্ষণ), নখে ছোট ছোট গর্ত বা নখ ভেঙে যাওয়া।

• এনথেসাইটিস (Enthesitis):

যেখানে টেন্ডন হাড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যেমন গোড়ালি বা কনুই—সেসব স্থানে ব্যথা।

• ড্যাকটাইলাইটিস (Dactylitis):

আঙুল বা পায়ের আঙুল ফুলে ‘সসেজ’-এর মতো দেখানো।

• অতিরিক্ত ক্লান্তি:

দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব।

• চোখে ব্যথা বা লালচে ভাব।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

যাদের সোরিয়াসিস রয়েছে তাদের সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি, বিশেষ করে যদি পরিবারে এই রোগের ইতিহাস থাকে। সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, তবে এর চেয়ে কম বা বেশি বয়সেও হতে পারে।

চিকিৎসার উপায়

বর্তমান চিকিৎসা পদ্ধতি সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এনেছে।

• ওষুধ:

ব্যথা কমাতে নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগ (NSAIDs), রোগের অগ্রগতি ধীর করতে DMARDs এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার নির্দিষ্ট অংশকে লক্ষ্য করে কাজ করা বায়োলজিক থেরাপি ব্যবহৃত হয়।

• জয়েন্টে ইনজেকশন:

ব্যথাযুক্ত জয়েন্টে ইনজেকশন দিলে ফোলা ও ব্যথা কমতে পারে।

• তাপ প্রয়োগ:

বিশেষ করে সকালে হালকা গরম সেঁক দিলে ব্যথা ও শক্তভাব কমতে পারে। তবে একটানা ২০ মিনিটের বেশি তাপ ব্যবহার করা উচিত নয় এবং অতিরিক্ত গরম কিছু ব্যবহার করা উচিত নয় যাতে ত্বক পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

• জীবনযাত্রার পরিবর্তন:

নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং ধূমপান পরিহার করা রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

• দ্রুত রোগ নির্ণয়:

প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করলে দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

• দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা:

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যেতে হয়, কারণ উপসর্গ কমে গেলেও পরে আবার ফিরে আসতে পারে।

রোগীদের জন্য পরামর্শ

সক্রিয় থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যথার কারণে অনেক সময় চলাফেরা বা ব্যায়াম এড়িয়ে যেতে ইচ্ছা হতে পারে, কিন্তু এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এতে পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জয়েন্ট আরও শক্ত হয়ে যেতে পারে।

সচেতনতা কেন জরুরি

সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস চলাফেরা সীমিত করে এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কারণে জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে সময়মতো শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীই স্বাভাবিক ও সক্রিয় জীবনযাপন করতে পারেন।

যদি আপনার সোরিয়াসিস থাকে এবং এর সঙ্গে জয়েন্টে ব্যথা বা শক্তভাব অনুভব করেন, তাহলে দেরি না করে একজন রিউমাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

লেখক: 

ডাঃ ফারজানা সুমি

এমডি (রিউমাটোলজি), এমআরসিপি (ইউকে), এফসিপিএস (মেডিসিন),

এফআরসিপি (এডিন), এফএসিআর ফেলো (আমেরিকা),

এপ্লার  ফেলোশিপ (রিউমাটোলজি), ইউলার  সার্টিফায়েড (রিউমাটোলজি)

কনসালট্যান্ট – রিউমাটোলজি

এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা