এভারকেয়ার বিডি
প্রকাশনা
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হার্ট ফেইলিউর কেন হয় এবং এর উপসর্গগুলো কী কী?

হার্ট ফেইলিউর কেন হয় এবং এর উপসর্গগুলো কী কী?
Author

প্রফেসর ডা. মোঃ আতাহার আলী

লেখক

হার্ট ফেইলিউর হলো এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যা যেখানে হৃদপিণ্ড শরীরের চাহিদা অনুযায়ী যথেষ্ট পরিমাণে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে না। এর অর্থ এই নয় যে হৃদপিণ্ড সম্পূর্ণ কাজ করা বন্ধ করে দেয়, বরং এটি দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করার ক্ষমতা হারায়। হার্ট ফেইলিউরের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো করোনারি আর্টারি ডিজিজ, যেখানে হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীগুলো চর্বিজাতীয় পদার্থের (প্ল্যাক) কারণে সংকীর্ণ বা অবরুদ্ধ হয়ে যায়। এর ফলে হৃদপিণ্ড পর্যাপ্ত রক্ত পায় না এবং সময়ের সাথে সাথে দুর্বল হয়ে পড়ে। উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনও একটি প্রধান কারণ। যখন হৃদপিণ্ডকে বারবার উচ্চচাপে রক্ত পাম্প করতে হয়, তখন এর পেশি মোটা ও শক্ত হয়ে যায়, যা ধীরে ধীরে রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা হ্রাস করে। হৃদরোগে আক্রান্ত হলে (হার্ট অ্যাটাক) হৃদপিণ্ডের পেশি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেটিও হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও হৃদপিণ্ডের ভালভে সমস্যা (ভালভুলার হার্ট ডিজিজ), হার্টের পেশি সম্পর্কিত রোগ (কার্ডিওমায়োপ্যাথি), ডায়াবেটিস, স্থূলতা, থাইরয়েডের অসুস্থতা, কিডনির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, অতিরিক্ত মদ্যপান কিংবা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণও হার্ট ফেইলিউরের জন্য দায়ী হতে পারে।

হার্ট ফেইলিউরের উপসর্গগুলো সাধারণত ধীরে ধীরে দেখা দেয় এবং অনেক সময় এগুলোকে বার্ধক্যজনিত সমস্যা বা অন্য কোনো অসুস্থতার সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়। সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ হলো শ্বাসকষ্ট, বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রমের সময় বা শুয়ে থাকার সময়। কারণ দুর্বল হৃদপিণ্ড যথেষ্ট রক্ত পাম্প করতে পারে না, ফলে ফুসফুসে তরল জমে যায়। দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও অবসন্নতাও সাধারণ লক্ষণ, কারণ শরীরের পেশি ও টিস্যু যথেষ্ট অক্সিজেন পায় না। হাত, পা, গোড়ালি বা পেট ফুলে যাওয়া (এডিমা) আরেকটি প্রধান উপসর্গ, যা শরীরে তরল জমার কারণে ঘটে। অনিয়মিত বা দ্রুত হার্টবিটও দেখা দিতে পারে, কারণ হৃদপিণ্ড তার কমে যাওয়া কার্যক্ষমতা পূরণ করার চেষ্টা করে। ফুসফুসে তরল জমে থাকার কারণে কাশি, হাঁপানির মতো শ্বাসকষ্ট বা গোলাপি রঙের কফ বের হওয়া দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত না পৌঁছালে মনোযোগের ঘাটতি, বিভ্রান্তি বা সতর্কতার অভাব দেখা দেয়। রোগটি বাড়ার সাথে সাথে হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা বা হালকা কাজকর্মও কষ্টকর হয়ে ওঠে।

উপসর্গের ধরন ও মাত্রা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং এটি নির্ভর করে হৃদপিণ্ডের কোন অংশে সমস্যা হয়েছে তার ওপর। কারো ক্ষেত্রে বাম দিকের হার্ট ফেইলিউর হয়, যেখানে বাম ভেন্ট্রিকল সঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে পারে না, ফলে শ্বাসকষ্ট বেশি দেখা দেয়। আবার কারো ক্ষেত্রে ডান দিকের হার্ট ফেইলিউর হয়, যা শরীরের নিচের অংশে তরল জমার কারণ হয়। অনেকের ক্ষেত্রে উভয় দিকেই সমস্যা হতে পারে। যেহেতু এ উপসর্গগুলো অনেক সময় অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যায়, তাই প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি। ডাক্তাররা সাধারণত শারীরিক পরীক্ষা, ইকোকার্ডিওগ্রাম, রক্ত পরীক্ষা বা ইসিজির মাধ্যমে হার্ট ফেইলিউর শনাক্ত করেন এবং এর মূল কারণ নির্ধারণ করেন।

সবশেষে বলা যায়, হার্ট ফেইলিউর একটি গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা, যার পেছনে বিভিন্ন উপসর্গ থাকতে পারে— শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, শরীর ফোলা, অনিয়মিত হার্টবিট এবং মানসিক বিভ্রান্তি, যা ইঙ্গিত দেয় যে হৃদপিণ্ড তার কাজ স্বাভাবিকভাবে করতে পারছে না। দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি, কারণ চিকিৎসা না করলে রোগটি সময়ের সাথে আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে এবং জীবনযাত্রার মান নষ্ট করতে পারে। তবে সময়মতো চিকিৎসা, জীবনধারায় পরিবর্তন এবং নিয়মিত যত্ন নিলে অনেকেই হার্ট ফেইলিউর নিয়ে দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

লেখক: 

প্রফেসর ডা. মোঃ আতাহার আলী

এমবিবিএস, এফসিপিএস (ইন্টারনাল মেডিসিন), এমডি (কার্ডিওলজি)

 সিনিয়র কনসালট্যান্ট – কার্ডিওলজি কেয়ার সেন্টার

এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা